স্বাধীনতা সংগ্রামে আলেম উলামাদের অবদান

প্রকাশিত হয়েছে : ৫:৫১:৩৪,অপরাহ্ন ১৯ এপ্রিল ২০১৮ | সংবাদটি ১১০ বার পঠিত

‘আলেম উলামা ও টুপি-দাঁড়ি’ মানেই স্বাধীনতা বিরোধী এমন নয়! আমাদের দেশে শান্তিপূর্ণ ও অধ্যাত্মশক্তিতে ইসলামের সার্বজনীন বিস্তরণে আলেম সমাজের ভূমিকা অবিস্মরনীয়। অথচ অজ্ঞতা বশতঃ অনেকে ধর্মপ্রাণ-নিরীহ মানুষকে স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে চিত্রিত করেন, তাদেরকে নাটক-সিনেমার ‘খল চরিত্র’ হিসেবে পোষাকী ব্যবহার গ্লানিকর ও দুঃখজনক। ‘রক্তসাগর’ পাড়ে মৃত্যুহীন ত্রিশ লাখ ‘বণি আদমের’ হাসির ঝিলিক ১৯৭১ এবং সোনালি আভায় উজ্জ্বল আমাদের লাল-সবুজের বিজয় নিশান।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল জালিমের বিরুদ্ধে, মজলুমের ২৬৩ দিনের এক সহসী প্রতিরোধ। তিতুমীর, হাজী শরিয়তুল্লাহ্, দুদু মিয়া, ফকির মজনুশাহর সংগ্রামী আদর্শে উজ্জ্বীবিত আমাদের আলেম সমাজ স্বাধীনতা সংগ্রামে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে ছিলেন এবং নিজ যোগ্যতার কারণে নেতৃত্বও গ্রহণ করেছিলেন। নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহেমদের অমর সৃষ্টি ‘জোসনা ও জননীর গল্প’ সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের কোন এক স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম মওলানা ইর্তাজ আলী কাসিমপুরী— যিনি কাহিনী সূত্রে পূর্বাপর আলোচিত। তিনি পাক আর্মির অন্যায় ‘ধর্মান্তর’ প্রক্রিয়ার প্রতিবাদ করে পরাধীনদেশে জুমআ’র নামায পড়াতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের ফলশ্রুতিতে নির্মমভাবে শহিদ হন। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ থেকে হুমায়ূন আহেমদ এ তথ্য লাভ করেন। ১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলার প্রথম সরকার গঠিত হলে মওলানা উবায়দুল্লাহ্ বিন সাইদ জালালাবাদী, মওলানা আব্দুল্লাহ্ বিন সাইদ জালালাবাদী, খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় পেরিয়ে চলে যান ভারতে এবং যোগাযোগ করেন স্বাধীন বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহেমদের সঙ্গে। তাঁরই নির্দেশনায় মওলানা জালালাবাদীভ্রাতৃদ্বয় ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’ কুরআন তেলাওয়াত-তাফ্সীর পরিচালনার মাধ্যমে ‘শব্দ সৈনিকে’র ভূমিকা পালন করেন। ১৪ ডিসেম্বর হানদার বাহিনীর বুলেটে অসংখ্য বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন পেশায় হোমিও ডাক্তার মওলানা অলিউর রহমান। শহিদ বুদ্ধিজীবী সৃতিসৌধের ফলকে নাম থাকা এ বীর সেনানীর লাশ খুঁজে পাওয়া না গেলেও তিনি ‘এপিটাফ’ রচনা করে রেখে গেছেন:”আমায় তোরা দিসগো ফেলে হেলায় ভরে পথের ধারে/ হয়তো পথিক করবে দোয়া দেখবে যখন কবরটারে”। শহিদ বুদ্ধিজীবী পেশায় হোমিও ডাক্তার মওলানা অলিউর রহমানের রচনাবলীর মধ্যে আছে — ছয় দফা ইসলাম বিরোধী নহে, শরীয়তের দৃষ্টিতে ছয় দফা, জয় বাংলা ও কয়েকটি শ্লোগান ইত্যাদি। আমাদের মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী আদর্শ সৈনিক, আওয়ামীলীগের অন্যতম কর্ণধার মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ।

২১ ফেব্রুয়ারি ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করে তিনি ১৯৫২ সালে পাকিস্তান আইন পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৪৩ দিন আত্মগোপনে থেকে নেতৃত্ব দেন এবং বহু সাধারণ মানুষ মওলানার প্রেরণায় ট্রেনিং ক্যাম্পে চলে যান।

দেশকে শত্রুমুক্ত করে বিজয় নিশান উড়িয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। হানাদার বাহিনীর কাছে মুর্তিমান আতঙ্ক, মওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের বাড়ি ও অসংখ্য মূল্যবান ধর্মীয়গ্রন্থ হানাদার বাহিনী জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে শেষ করে দেয়। “ভোটের বাক্সে লাথি মারো; বাংলাদেশ স্বাধীন করো”— এমন দীক্ষায় জাতিকে উজ্জ্বীবিত করে ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ‘মুজিবনগর সরকারে’র সর্বদলীয় উপদেষ্টামন্ডলীর তিনি সভাপতি মনোনিত হন। মহান মুক্তি সংগ্রামে ভূমিকার জন্য দেরাদুনে ভারতীয় জেনারেল রুদ্র, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে ‘প্রোফেট অব্ ইনডিপেডেন্স’ আখ্যায়িত করেছিলেন। ১৯৫৭ সালের ঐতিহাসিক ‘কাগমারী সম্মেলনে’ মওলানা ভাসানী পাকিস্তানী নির্যাতনের প্রতিবাদ করে ‘আস্আলামু আলাইকুম্’ উচ্চারণের মাধ্যমে সর্বপ্রথম স্বাধীনতার ডাক দেন। ১৯৭০ এ মওলানার জনসভা নিয়ে কবি শাম্সুর রহমান লিখলেন ‘সফেদ পাঞ্জাবী’ কবিতাটি।

আবুজাফর উবায়দুল্লাহ্ লিখলেন ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি’। আর আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীর নিবেদন: “আমাদের মিলিত সংগ্রাম- মওলানা ভাসানীর নাম….. মুখের ভাষায় শুনি, বুকের সাড়ায় শুনি, চোখের তারায় দেখি নাম— মওলানা ভাসানীর নাম। পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণের কালাম- মুখের ভাষায় শুনি নাম— মওলানা ভাসানীর নাম”।

About loskor @loskor

Leave a Reply

Your email address will not be published.

https://gnogle.ru/project/edit/102
WP Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com