Main Menu

স্বাধীনতা যুদ্ধের সূতিকাগার মুজিবনগর এবং ১৭ এপ্রিল প্রসঙ্গে…

এম.সোহেল রানা; মেহেরপুর

.
[প্রথম পর্ব]
বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার তৎকালীন (বৈদ্যনাথতলা আম্রকানন) তথা বর্তমান নাম মুজিবনগর, আর এই মুজিবনগর থেকেই হয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রশিক্ষন গ্রহন, গঠণ হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন অস্থায়ী মুজিবনগর সরকার, মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার প্রত্যয়ে গ্রহন করেছিল শপথ, গড়েছিল মাত্র ন’মাসে বিশ্বের দরবারে একমাত্র বাঙালী জাতিই রক্তক্ষয়ে অধিকার আদায় কল্পে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ ইতিহাস। তাই মুজিবনগরকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলা একে বারেই অসম্ভব।
মেহেরপুরের মুজিবনগরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠণ করা হয়েছিল এবং মুজিবনগরকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী রাজধানী করা হয়েছিল, বর্তমানে বছরের সব সময়ই বহু দূর-দূরান্ত হতে প্রচুর পরিমানে মানুষ (বৈদ্যনাথতলা আম্রকানন) তথা মুজিবনগর পরিদর্শণ, শিক্ষা সফর ও বনভোজন করতে আসে। এই স্থানটি মেহেরপুর জেলা সদরের মুজিবনগর উপজেলায় অবস্থিত। সড়ক পথে মুজিবনগর মেহেরপুর সদর থেকে দূরত্ব ১৫-১৬ কিঃমিঃ দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল অস্থায়ী সরকার গঠন ও ১৭ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল (পূর্বের জেলা) কুষ্টিয়ার মেহেরপুর মহকুমা বর্তমানে মেহেরপুর জেলা সদরের মুজিবনগর উপজেলার অন্তর্গত বৈদ্যনাথতলার ভবেরপাড়া গ্রামের আম্রকাননে। বর্তমান যে স্থানের নাম মুজিবনগর । ১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর অনুপস্থিতিতে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠণ করা হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দ্বায়িত্ব নেন উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পিত হয় তাজউদ্দীন আহমদ এর উপর।

বাংলাদেশের প্রথম সরকার দেশী-বিদেশী সাংবাদিকের সামনে শপথ গ্রহণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে ২৬ মার্চ হতে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বাঙালী জাতির জীবনে এটি এক ঐতিহাসিক দিন। স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এদিন শপথ গ্রহণ করেন। মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী সহ মন্ত্রীসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান- চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী এম.এম.এ।

মন্ত্রীসভাকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন, ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ পিএসপি, স্থানীয় আনছার, পুলিশ ও ইপিআর কুচকাওয়াজে অংশ নিয়ে ছিল।
১৯৭১ সালের অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়, ১০ এপ্রিল প্রতিবেশী বন্ধুদেশ ভারতে । পাকিস্তানী বাহিনীকে প্রতিরোধ ২৬ মার্চ ১৯৭১ তারিখেই শুরু হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সংগঠণ ও সমন্বয়ে, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে এবং সর্বোপরি, এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সহায়তাকারী দেশ ভারতের সরকার ও সেনাবাহিনী সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক রক্ষায় এই সরকারের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এই সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধতা যুদ্ধের রূপ নেয় এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা প্রতিভাসিত হয়ে ওঠে।

২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট সংঘটিত হবার সময় যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানী বাহিনীর পক্ষ হতে গ্রেফতার করা হয় তার আগ মুহূর্তে ২৫ মার্চ দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ইপিআর এর একটি ছোট ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে জান। এরপর ২৬ মার্চ বিকালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট স্বাধীন বাংলাদেশ বেতারকেন্দ্র হতে আমাদের মেহেরপুরের গর্ব তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জনাব এম,এ হান্নান এবং পরবর্তীতে ২৭শে মার্চ বিকালে মেজর জিয়াউর রহমান আনুষ্ঠানিক ভাবে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ হতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মূলত সেই দিন হতেই বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র রূপে পরিচিতি লাভ করে।

এদিকে ২৫ মার্চের ভয়াবহ গণহত্যার সময় আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান নেতা তাজউদ্দীন আহমদ নিজ বাসভবন ছেড়ে পালিয়ে জান। এসময়েই তিনি বাংলাদেশ সরকার গঠনের পরিকল্পনা শুরু করেন। প্রথমে আত্মরক্ষা, তারপর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পালটা আক্রমণ এই নীতিকে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য তিনি সরকার গঠনের চিন্তা করতে থাকেন। এরই মধ্যে ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় তিনি ফরিদপুর-কুষ্টিয়া পথে পশ্চিম বাংলার সীমান্তে পৌঁছান।

ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পদার্পণ করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার বিষয়ে মেহেরপুরের তৎকালীন মহকুমা শাসক তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী (বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী বিষয়ক উপদেষ্টা) তাদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন। সীমান্ত অতিক্রম করার পর ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর তৎকালীন মহা-পরিদর্শক গোলক মজুমদার, তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শণ পূর্বক তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। গোলক মজুমদারের কাছে সংবাদ পেয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর তৎকালীন মহা-পরিচালক কে,এফ রুস্তামজী তাদের আশ্রয়স্থলে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন এবং পূর্ব বাংলার সার্বিক পরিস্থিতি ও বাঙালীর স্বাধীনতা লাভের অদম্য স্পৃহা সম্পর্কে সম্যক অবগত হন। সীমান্তে পৌছে তাজউদ্দীন আহমেদ দেখেন যে, বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনাদের সমর্থনে ভারত সরকার থেকে নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ভারতীয় সামরিক বাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছুই করার নেই। মুক্তিফৌজ গঠণের ব্যাপারে তাজউদ্দীন আহমদ বি,এস,এফ এর সাহায্য চাইলে তৎকালীন বি,এস,এফ প্রধান তাকে বলেন যে, মুক্তি সেনা ট্রেনিং এবং অস্ত্র প্রদান সময় সাপেক্ষ কাজ । তিনি আরো বলেন যে, ট্রেনিং বিষয়ে তখন পর্যন্ত ভারত সরকারের কোন নির্দেশ না থাকায় তিনি মুক্তিবাহিনীকে ট্রেনিং ও অস্ত্র দিতে পারবেন না।






Related News

Leave a Reply

Your email address will not be published.