Main Menu

বেলুনে গ্যাস ভরার সময় বিস্ফোরণে নিহত ৬ শিশু, আশঙ্কাজনক ৬

হলিবিডি প্রতিনিধিঃ : রাজধানীর রূপনগরে বেলুনে গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ঝরে গেছে ৬ শিশুর প্রাণ। আহত হয়েছে অন্তত ২০ জন। এর মধ্যে কমপক্ষে ৬ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

বুধবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে রূপনগরের মনিপুর স্কুলের পূর্বপাশে ১১ নম্বর সড়কের মাথায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে নিহতদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।

আহতদের ঢামেক, সোহরাওয়ার্দীসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘কারও হাত নেই, কারওবা পা নেই, কারও নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে। কারও চেহারা ঝলছে গেছে। ছোপ ছোপ কালচে তাজা রক্ত রাস্তায় গড়াচ্ছে।

আনুমানিক ৬-১৪ বছর বয়সী ১০-১২ জন খুদে শিশু মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। উফ! বীভৎস ও মর্মান্তিক সেই দৃশ্য দেখে বুক আঁতকে ওঠে। হতাহতদের স্বজনের কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে পুরো রূপনগরের বাতাস। গোটা এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।

এরপর নিহত ও আহতদের হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, যারা নিহত হয়েছে, তারা হল- রমজান (৮), নূপুর (৭), শাহীন (৯), ফারজানা (৬), রুবেল (১১) ও রিয়া (৭)।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে রূপনগর থানার এসআই লোকমান হোসেন জানান, যাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে। তবে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

ঢামেক হাসপাতালে যাদের ভর্তি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ১২ জন শিশু, দুইজন পুরুষ এবং একজন নারী রয়েছেন। তারা হলেন জুয়েল (২৫), আবু সাঈদ (২০), জান্নাত (২৫), তানিয়া (৮), বায়েজিদ (৭), জামেলা (৭), মিজান (৭), মীম (৮), ওজুফা (৯), মোস্তাকিম (৮), মোরসালিনা (৯), নিহাদ (৮), অর্ণব ওরফে রাকিব (১০), জনি (১০) এবং সিয়াম (১১)। এদের মধ্যে আবু সাঈদ বেলুন বিক্রেতা। জুয়েল রিকশাচালক। জান্নাত বাসা-বাড়িতে কাজ করে। শিশুদের বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের পরিবারের।

ঢামেক হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আলাউদ্দিন বলেন, আমাদের এখানে আসা ১৫ জনের মধ্যে বেশির ভাগই শিশু। আহতদের মধ্যে ৪-৫ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক উত্তম কুমার বড়–য়া সাংবাদিকদের বলেন, রূপনগরের ঘটনায় আমাদের এখানে ১২ জন হতাহত এসেছে। এর মধ্যে ৫ জন মৃত। আহত অবস্থায় ৭ জন এসেছিল। তাদের মধ্যে দুইজন এখন ভর্তি আছেন। তারা শঙ্কামুক্ত।

এছাড়া দুইজনকে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতালে রেফার করেছি। তাদের শরীরের ৬০-৭০ ভাগ পুড়ে গেছে। এই দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি জানান, নিহতদের দেহ বিকৃত অবস্থায় আছে। তাই এসব দেহের ছবি মিডিয়ায় প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

রূপনগর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, মনিপুর স্কুলে সামনে এক ব্যক্তি সিলিন্ডার থেকে বেলুনে গ্যাস ভরে শিশুদের কাছে বিক্রি করছিলেন। এ সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন। আহতদের মধ্যে কারও কারও হাত-পা বা শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আনোয়ার হোসেন বলেন, যেভাবে গ্যাস তৈরি করে বেলুনে ভরা হতো, সেটি ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণেই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

যেভাবে ঘটনা : প্রত্যক্ষদর্শী মোবারক বলেন, সিলিন্ডারে নিজেই গ্যাস তৈরি করেন আবু সাঈদ। ভেতরে পানি এবং কেমিক্যালের মিশ্রণ ঘটিয়ে গ্যাস তৈরি করেন তিনি। পরে ওই গ্যাস বেলুনে ভরা হয়। ঘটনার ৫ মিনিট আগে আমি মনিপুর স্কুলের সামনে আসি। সিলিন্ডারের মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। এ সময় আবু সাঈদ সিলিন্ডারের মুখ খুলে ছাই এবং পানি ঢালে। পরে সেখানে লাঠি দিয়ে গুঁতা দেয়। এ সময় হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে।

বিস্ফোরণের সময় আবু সাঈদের শিশুসন্তানও ঘটনাস্থলে ছিল। তারা দুইজনই আহত হয়। আবু সাঈদের ভুঁরি বের হয়ে যায়। এ সময় পেটে হাত দিয়ে ধরে দ্রুত দৌড়ে রিকশা নিয়ে একাই স্থানীয় হাসপাতালে যায়।

অপর প্রত্যক্ষদর্শী সাকিব বলে, আমরা ৩ বন্ধু রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এ সময় দেখি একজন লোককে (আবু সাঈদ) ঘিরে অনেকগুলো শিশু দাঁড়িয়ে আছে। কৌতূহলবশত সেখানে গিয়ে দেখি, একটি সিলিন্ডারের ভেতর পানি, ছাই এবং কেমিক্যাল দিয়ে গুঁতাগুঁতি করছে ওই লোক।

তাকে মামা সম্বোধন করে বলি, এটা তুমি কী করছ? সে কোনো উত্তর দেয় না। পাশ থেকে একজন উত্তর দেয়, ওই লোক (আবু সাঈদ) বেলুনে গ্যাস ভরে বিক্রি করে। গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। তাই সিলিন্ডারে গ্যাস তৈরি করছে। এ কথা শোনার পর আমরা ৩ বন্ধু সেখান থেকে চলে যাই।

এর ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটে। দ্রুত এসে দেখি, ঘটনাস্থলে হতাহত অবস্থায় ৭ জন পড়ে আছে। এর মধ্যে ৪ জনই মৃত। এক নারীর হাত ছিটকে এসে আমার সামনে পড়ে। ওই নারী ছিল অজ্ঞান অবস্থায়। একজন শিশু ছিন্নভিন্ন অবস্থায় লাফাচ্ছিল। একজন মাদ্রাসাছাত্রকে নাড়িভুঁরি বের হওয়া অবস্থায় দেখি।

জয় নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, রূপনগর ১১ নম্বর সড়কে দুই-তিনদিন পরপরই গ্যাস বেলুন বিক্রি করতে আসতেন এক ব্যক্তি। আসা মাত্রই তাকে ঘিরে ধরত ফজর মাতব্বরের বস্তির শিশুরা। বরাবরের মতো বুধবারও বেলুন বিক্রেতার গাড়িটিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল শিশুরা। সেটিই কাল হল তাদের।

গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মুহূর্তেই ঝরে গেছে পাঁচ শিশুর তাজা প্রাণ। জয় জানান, একটি ভ্যানগাড়িতে করে ওই ব্যক্তি মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে গ্যাস বেলুন বিক্রি করতেন। বুধবার বিকালে রূপনগর ১১ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় ফজর মাতব্বরের বস্তির সামনে বেলুন বিক্রি করতে আসেন তিনি।

তাকে দেখামাত্রই বস্তির শিশুরা তাকে ঘিরে ধরে। এ সময় সিলিন্ডারে পাউডারজাতীয় কিছু একটা ভরছিলেন ওই বেলুন বিক্রেতা। এর পরপরই হঠাৎ বিকট শব্দে সিলিন্ডারটি বিস্ফোরিত হয়।

বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে আশপাশে থাকা ১০-১২ জন প্রায় ১৫ ফুটের মতো ছিটকে পড়েন। পেটে আঘাত পাওয়া আরেক শিশু দৌড়ে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পরই সে লুটিয়ে পড়ে। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

স্থানীয় ঝালমুড়ি বিক্রেতা মো. হোসেন বলেন, বিস্ফোরণের স্থান থেকে কিছুটা দূরে আমি ঝালমুড়ি বিক্রি করি। বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ওই বেলুন বিক্রেতা ভ্যান নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালে আমি তাকে চলে যেতে বলি। এরপর একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে তিনি একটি টিনশেডের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। কিছুক্ষণ পর বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই।

বিস্ফোরণে আহত নারী জান্নাত বেগমের স্বামী নজরুল ইসলাম বলেন, বিকালে বাজার করে ফেরার সময় ১১ নম্বরের সড়কের মাথায় আসতেই বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণে তার স্ত্রীর ডান হাতের একটি অংশ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।






Related News

Comments are Closed