Main Menu

ডেঙ্গি প্রতিরোধে আতঙ্ক নয়, নিজেদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে : ডাঃ নাসরীন আখতার

বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে যতটুকু জেনেছি, দেশব্যাপী ডেঙ্গু (প্রকৃত উচ্চারণ ডেঙ্গি) ভালোই আতংক ছড়াচ্ছে ।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা এখনও হয়তো এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত নন অথবা ভুল জানেন। এমনকি, সমসাময়িক পরিস্থিতিতে অনেক শহরের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যেও এবারের ডেঙ্গি সম্পর্কে সচেতনতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। তাই জনস্বার্থে ডেঙ্গি সম্পর্কিত কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপনের চেষ্টা করছি ।

 

১. শুধুমাত্র স্ত্রী এডিস মশা ডেঙ্গি ভাইরাস বহন করতে পারে এবং এটিই একমাত্র ভেক্টর হিসেবে কাজ করে।

 

২. স্ত্রী এডিস মশা বেশী ওপরে উঁড়তে পারে না এবং শুধু দিনের বেলায়ই কামড়ায়। এডিস মশার বাইরে অন্য কোনো মশাই ডেঙ্গি ভাইরাস ছড়াতে পারে না। এডিস মশার লালার সাথে ভাইরাসটি ছড়ায়। সেজন্য দিনের বেলায়ও মশারি টানিয়ে, সাথে অন্যান্য মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা রেখে ঘুমানো উচিৎ।

 

৩. মশার কামড় হতে বাঁচার জন্য কয়েল,এরোসল, রিপিলেন্ট ক্রিম এবং যথাসম্ভব শরীর ঢেকে কাপড় পরা আবশ্যক।

 

৪. বর্ষাকালে ডেঙ্গির প্রকোপ ঘটে। জুলাই হতে অক্টোবর, বিশেষ করে এই চার মাস সাবধানে থাকতে হবে।

 

৫. ২০০০ সাল থেকে আমাদের দেশে এ জ্বর উল্লেখ করার মতো দেখা দিচ্ছে এবং প্রতিবারই রাজধানী ঢাকা হয় আক্রমণের মূল কেন্দ্র। ঢাকায় এসেই পেরিফেরির লোকজন ডেঙ্গী ভাইরাসে আক্রান্ত হোন এবং নিজ এলাকায় বহন করে নিয়ে যান, অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট এলাকার এডিস মশা ওই রোগীদের কামড়ানোর মাধ্যমে ভাইরাস বহন করা শুরু করে।

 

৬. এ জ্বরে হাড়ভাঙ্গার ( বোন ব্রেকিং) মতো ব্যাথা হয়। শরীর ম্যাজম্যাজ হতে শুরু করে, হাড়ের ব্যাথা এতো বেশী হয় যেনো হাড় ভেঙ্গে যাচ্ছে। চোখের পেছনের ও মেরুদন্ডের হাড়ে বেশী ব্যাথা অনুভব হয়। জ্বর ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্তও হতে পারে। ১ হতে ২ সপ্তাহের মতো জ্বর থাকে। তারপরও শরীর সুস্থ হতে অনেক সময় নেয়। হেমোরেজিক ডেঙ্গি হলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে যেমন : চোখের কনজাংটিভার নীচে, চামড়ার নীচে, শরীরের বিভিন্ন স্পেসে, এমনকি ব্রেইন হেমোরেজও হতে পারে।

 

৭. তবে এবারের ডেঙ্গি একেবারেই ভিন্ন আচরণ করছে। ক্লাসিকেল সিনড্রোমগুলো অনেক সময়ই অনুপস্থিত। সামান্য হতে বেশি জ্বর, শরীর ব্যাথাও সাধারণ বা সামান্য, কিন্তু হঠাৎ করেই রোগী শকে চলে যায় বা কোলাপ্স করে। জ্বর ছাড়ার পরই শকটা বেশী হয়। তাই জ্বরকে মামুলি ভাইরাস জ্বর ভেবে সাধারণ চিকিৎসাই চলে,কিন্তু শকে গিয়েই ঘটায় বিপত্তি, সে অবস্থা থেকে ফেরত আসা মুশকিল।

 

৮. শকটা মূলত ভাসকুলার লিকেজের জন্য হয়। ভেসেল বা রক্তনালি হতে রক্তের জলীয় অংশ বের হয়ে যায়, এতে রক্ত কনসেনট্রেটেড হয়ে যায়, শরীরের আভ্যন্তরীন স্বাভাবিক অবস্থা পুরোটাই এলোমেলো হয়ে যায়। রক্তের জলীয় অংশ কমে রোগী শকে যায়,দ্রুত এ শক রিকভারি না হলে শরীরের বিভিন্ন অর্গান যেমন : কিডনি, লিভার লাঙ্গস্, ব্রেইন অকেজো হয়ে পড়ে,যাকে বলে মাল্টি অর্গান ফেইলিওর। এ অবস্থা থেকে রিকভারি সাধারণত হয় না।

 

৯. কিন্তু শুরতেই যদি ডিজিজ ডায়াগনোসিস হয় এবং অযথা হুলস্থূল না করে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া যায়,সুস্থ হওয়া কঠিন কিছু নয়।

 

১০. জ্বর হলেই ইগনোর না করে ৫ দিনের মধ্যে ব্লাডে এনএসওয়ান এন্টিজেন আছে কিনা দেখতে হবে। এটি হলো ভাইরাল প্রোটিন, যা ভাইরাসের উপস্থিতি জানান দেয়। ৫ দিন পর এনএসওয়ান এন্টিবডিও ব্লাডে চলে আসে। তখন আর ব্লাডে এন্টিজেন পাওয়া যায় না।

 

১১. এন্টিজেন, এন্টিবডি ডিটেকশন পাশাপাশি কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট সংক্ষেপে সিবিসি করালেও রোগ নির্ণয় সহজ হয়। এ টেস্টে রক্তের ঘনত্ব বাড়ার কারণে হিমাটোক্রিট বেড়ে যায়, এছাড়া প্লেটেলেট এবং হোয়াইট ব্লাড সেল কমে যায়।

 

১২. নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের গতিবিধি নির্নয় সহজ। এছাড়া বারবার বডির ভাইটাল সাইন যেমন ব্লাড প্রেসার,পালস্, টেম্পারেচার, প্রস্রাবের পরিমাণ, পানিশূন্যতা ইত্যাদি দেখা খুবই জরুরি। আক্রান্ত রোগীর ব্লাড প্রেসার কমতে থাকবে,পালস বাড়বে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমবে। ক্লিনিকেল সাইনগুলো মনিটর করা, পানিশূন্যতা রোধে মুখে পানি ও অন্যান্য তরল পানি জাতীয় খাবার দেয়া খুবই জরুরি। যদি মুখে পান করতে না পারে অবশ্যই আইভি ফ্লুয়িড বা শিরাপথে নরমাল স্যালাইন পুশ করতে হবে।

 

১৩. জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

১৪. রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা,শরীরের প্রয়োজনীয় পানিসাম্যতা রক্ষা করা, সিবিসিএর মাধ্যমে রোগের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা, এসবই এখনকার ডেঙ্গি রোগের চিকিৎসা।

 

১৫. আবারও বলছি, জ্বর ভালো হবার পরবর্তী সময়টাতে রোগী শকে যায় বেশী। তাই ওই সময়টা মানে জ্বর পরবর্তী সময়টাতেও রোগীর বেশী খেয়াল রাখতে হবে।

 

১৬. একবার ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হলে লাইফটাইম এন্ডিবডি (আই জি জি) শরীরে থাকে। ডেঙ্গি ভাইরাসের আপাতত জানামতে প্রজাতি চারটি। রোগী পরবর্তীতে একই প্রজাতি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম, কিন্তু অন্য প্রজাতি দ্বারা আক্রান্ত হলে খুবই বিপদজনক। রোগীর রক্তে থাকা ক্রস এন্টিবডির ( এটিরও লাইফটাইম থাকে) সাথে নব্য প্রজাতির এন্টিজেনের বিক্রিয়ার ফলে রোগী মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

 

১৭. রোগের চিকিৎসা বা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে প্রতিরোধই শ্রেয়। যেকোনো উপায়েই এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রুখে দিতে হবে। পরিষ্কার পানি যেনো আশেপাশে কোনও পাত্রে জমা না থাকে, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। এডিস মশার প্রজননের ক্ষেত্রসমূহে ঔষধ ছিটিয়ে ওদের নিশ্চিহ্ন করতে হবে। মশার কামড় যেভাবেই হোক এড়িয়ে যেতে হবে।

 

১৮. ডেঙ্গি আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই মশারির ভিতরে রেখে চিকিৎসা ও সেবা চালাতে হবে।

 

১৯. ডেঙ্গির প্রতিরোধে এখনও কোনো টিকা আবিষ্কার হয় নি। নানা প্রজাতির এবং পরিবর্তনশীল হওয়ায় কার্যকর ভেকসিন আবিষ্কৃত হবে কিনা সন্দেহ আছে।

 

২০. এবারের রোগের লক্ষণে মনে হচ্ছে নুতন কোনো প্রজাতির ডেঙ্গি ভাইরাসের আগমন ঘটেছে এবং এ ফ্লাভিভাইরাস সদা পরিবর্তনশীল, যা চিকিৎসাসেবা এবং ভেকসিন বের করার পথে বিরাট চ্যালেঞ্জ।

 

পরিশেষে বলবো, সামনে পবিত্র ঈদুল আজহা। একটি ঈদ রাজধানীর মানুষজন গ্রামে বা নিজ নিজ এলাকায় না করে ঢাকায়ই করুক না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে রোগাক্রান্ত হলে সহজে চিকিৎসা পাওয়া যাবে না, এছাড়া গ্রামে নিজের প্রিয় মানুষদের বিপদমুক্ত রাখার জন্য এ সময়ে ঢাকার বাইরে না যাওয়াই ইতিবাচক । আমি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত, এখানে ডেঙ্গির কর্ণার খোলা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫০ এর অধিক রোগী ভর্তি হয়েছেন, অনেকে আরোগ্য লাভ করেছেন, নুতন রোগীও ভর্তি হচ্ছেন । উল্লেখ্য যে, এ পর্যন্ত এখানকার সব রোগীই ঢাকা থেকে রোগ নিয়ে এসেছেন। শিশু ওয়ার্ডে আলাদা কর্ণার খোলা হয়েছে, বাচ্চারা মা-বাবা ও পরিবারের লোকজন হতে আক্রান্ত হচ্ছে । গর্ভবতী মায়ের ডেঙ্গি হলে ভাইরাল এন্টিজেন গর্ভের ভ্রুনকেও আক্রান্ত করতে পারে।

 

আতঙ্কিত হওয়া যাবে না । আমরা যদি একটু যত্নবান হই, তাহলে ডেঙ্গি মহামারী আকার ধারণ করতে পারবে না। টেস্টের মূল্য সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং সরকারিভাবেও বিনামূল্যের টেস্ট কিটস্ বিভিন্ন বিভাগে পাঠানো হয়েছে। আরও কিটস্ বিদেশ থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে। আমরা আশাবাদী থাকি,সাবধান থাকি, নিরাপদ থাকি ও প্রিয়জনকে নিরাপদে রাখি। সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করি ।

 

লেখক :

ডাঃ নাসরীন আখতার

বিভাগীয় প্রধান

অবস্ এন্ড গাইনী ডিপার্টমেন্ট

সিওমেক, সিলেট ।

 






Related News

Comments are Closed