Main Menu

জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ড : ৩৮ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি মামলা

হলিবিডি ডেস্কঃ ১৯৮১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত ৫৩ বার মামলার তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তখনকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কতিপয় বিদ্রোহী সেনা সদস্যের হাতে মর্মান্তিকভাবে নিহত হন। তখন তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ছিলেন বেসামরিক রাষ্ট্রপতি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। জিয়া হত্যাকান্ডের পর বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার সামরিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সংক্ষিপ্ত বিচারে ১৩ জন সামরিক কর্মকর্তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করলেও পুলিশ বাদী হয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা হত্যা মামলাটি দীর্ঘ ৩৮ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। সূত্র জানায়, তৎকালীন বিএনপি সরকারের নির্দেশে এই যে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হয় এবং তারপর থেকে ফাইলটি চাপা পড়ে আছে। আদালত বারবার তাগাদা দিলেও ১৯৯১-৯৫ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সরকারও মামলাটি নিষ্পত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেনি; বরং এ নিয়ে চুপচাপ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম সিএমএম আদালত দীর্ঘ একটি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ দিয়ে মামলাটির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেখানে আদালত বলেছেন, একজন বেসামরিক রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়া হত্যা মামলাটি সিভিল কোর্টে বিচার হওয়া উচিত। কোর্ট মার্শালে যে তদন্ত ও বিচার হয়েছে, তাতে আইনি প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি। মামলাটির কেস ডকেট পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

যেভাবে আলোচনায় আসে সিভিল মামলাটি : জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর সামরিক ট্রাইব্যুনালে সংক্ষিপ্ত বিচারে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারের মৃত্যুদন্ড ফাঁসিতে কার্যকর করা হয়। কিন্তু সিভিল আইনে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় দায়ের করা মামলাটি ফাইলচাপা পড়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী এই মামলার তারিখ পড়েছে বারবার। ১৯৮১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ৫৩ বার এই মামলার তারিখ পড়ে আদালতে। ১৯৯৫ সালে চাঞ্চল্যকর মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলার কার্যক্রম শুরু হলে বিষয়টি নজরে আসে আদালতের। তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর মুখ্য হাকিম এস এম মতিউর রহমান সর্বপ্রথম পুলিশের কাছে জানতে চান মামলাটির সর্বশেষ অবস্থা। কয়েকদফা তাগাদা দিয়েও কোনো সন্তোষজনক জবাব মেলেনি। বারবার বলা হয়েছে, আইওর কাছ থেকে রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। তখন ক্ষমতায় বিএনপি এবং খালেদা জিয়া ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আদালতের বারবার তাগাদার বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হলে এ নিয়ে চুপচাপ থাকার নির্দেশ আসে।

সিএমপির চিঠিতে প্রকাশ পায় ’৮১ সালের স্থগিতাদেশ : আদালতের বারবার নির্দেশনা এবং কারণ দর্শানোর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৫ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন সিএমপি কমিশনার ৩০৩২ নম্বর স্মারকে পুলিশ সদর দফতরে একটি চিঠি লেখেন। এই চিঠিতেই প্রথম প্রকাশ পায় ২৪ জুন ১৯৮১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক সিভিল মামলাটির সব কার্যক্রম স্থগিত রাখার গোপন নির্দেশটির কথা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ শাখার নম্বর : ৩৮৩-৬/ ১০৬/ ৮১- পিএল স্মারকের চিঠিটি দেওয়া হয় আইজিপিকে। সেকশন অফিসার এ ডবিøউ এম মোস্তফা স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ১৬-০৬-১৯৮১ তারিখে আইসিসি মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেহেতু সেনা কর্তৃপক্ষ এই মামলার তদন্ত কার্যক্রম গ্রহণ করেছে, সেহেতু পুলিশের এখানে আবার তদন্ত করার প্রয়োজন নেই। ৪৯৯৮ নম্বর স্মারকে ০৮-০৭-৮১ তারিখে সিএমপি কমিশনার এ এইচ এম বি জামানকে লেখা ‘কনফিডেনশিয়েল’ মার্ক করা চিঠিতে এই নির্দেশনার কথা জানায় পুলিশ সদর দফতর। আইজিপির পক্ষে স্বাক্ষর করেন সহকারী আইজিপি (অপরাধ) সি বি দাশ। চিঠিতে সরকার পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জিয়া হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখার নির্দেশের বিষয়টি অবহিত করা হয়।

বিচারপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন সরকার তখন ক্ষমতায় : ১৯৯৫ সালে খালেদা জিয়ার সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে জিয়া হত্যা মামলা নিয়ে সিএমপি কমিশনারের লেখা চিঠিতে বলা হয়, ‘সরকারি নির্দেশে মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল। অদ্যাবধি কোনো নির্দেশ না পাওয়ায় কার্যক্রম গ্রহণ সম্ভব হয় নাই। ইহা ছাড়া উক্ত মামলার আইও অত্র সংস্থায় কর্মরত নাই। অপরদিকে বিজ্ঞ আদালত হইতে বারবার ফৌজদারী কার্যবিধি ১৭৩ ধারা মতে তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিষ্পত্তিকালে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হল।’ এই চিঠি লেখার পর তৎকালীন সিএমপি কমিশনার শহুদুল হককে ঢাকায় জরুরি তলব করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে এ বিষয় নিয়ে চুপচাপ থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।১৯৯৭ সালে সিএমএম আদালত যা বলেছেন : নিয়ম অনুযায়ী জিয়া হত্যা মামলার তারিখ কয়েক মাস পরপর পড়ছিল। ১৯৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) এ কে এম কামাল উদ্দীন এই মামলায় একটি দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরে যে আদেশটি দেন তা একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে। এখানে আদালতের পর্যবেক্ষণের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো।

আদালত বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে স্মারকটির কথা ইতিমধ্যে আদালতকে অবহিত করা হয়েছে তা সিএমএম আদালতের নিকট ১৩-০১-১৯৯৭-এর পূর্বে পেশ করা হয় নাই। বর্ণিত আইসিসি সভা ও সিদ্ধান্তের বিষয়েও আদালতে কিছু পেশ করা হয় নাই। ঘটনার সময় এবং পরবর্তীকালে অত্র মামলা বিচারাধীন সময়ে দেশের সংবিধান ও সংবিধানের অধীনে গঠিত আদালতসমূহ প্রচলিত আইনে বিদ্যমান ছিল। অত্র হত্যাকান্ডটি ছিল বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের একটি আইনসম্মত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং দেশের একটি অংশকে বাকি অংশ হতে সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করার প্রয়াস। এই ঘটনায় বিপুলসংখ্যক বেসামরিক ব্যক্তি ভিকটিম হিসেবে নিহত, আহত বা সাক্ষী হিসেবে জড়িত ছিলেন বা আছেন।

বরং প্রতিভাত হয়েছে, সংশ্লিষ্টরা স্বেচ্ছাচারিতা ও আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের প্রয়াস পেয়েছেন। এই মামলায় রাষ্ট্রের প্রতি বিদ্রোহ করার অভিযোগ আছে এবং এই প্রক্রিয়ায় বেসামরিক প্রশাসন, বেতার এবং টেলিভিশনকে জড়িত করা হয়েছিল। সঠিক তদন্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি এবং অপরাধ সংঘটনের ব্যাপকতা ও গভীরতা জানা যেতে পারত। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয় যে, দেশের সকল আইন প্রণয়ন করা হয় একটির সাথে আরেকটি সংগতি রেখে। ফৌজদারি আইনের ৫৫৪ ধারার সাথে সংগতিপূর্ণভাবে আর্মি অ্যাক্ট প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বিধিসমূহ পালনে ব্যত্যয় ঘটেছে। সর্বোপরি জেনারেল কজেজ অ্যাক্ট দেশের প্রচলিত সকল আইনের ওপর প্রাধান্য পায়। এখানে এর প্রতিও কোনোরূপ তোয়াক্কা করা হয় নাই।

উপরোক্ত আলোচনা ও বিশ্লেষণ মতে প্রতিভাত হয় যে, অত্র মামলাটি প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী চলার প্রক্রিয়া এবং তদন্ত চলার গতিকে আইনবহিভর্‚ত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিঘ্নিত করা হয়েছে এবং বন্ধ রাখা হয়েছে।’

জিয়া হত্যা মামলার আসামি কারা : জিয়া হত্যা মামলাটি চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় দায়ের করেছিলেন সিএমপির তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মোকাররম হোসেন। মামলা নং -২(৬)৮১, ধারা-১২০ (বি)/ ১২১ /১২২/৩০২, তারিখ : ০১-০৬-১৯৮১। সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতির অবস্থানকালে দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে পরে বাদী নিজেই চাকরি হারান। তখন তৎকালীন সহকারী কমিশনার আবদুল হাকিম খানকে আইও নিয়োগ করা হয়। মামলায় আসামি করা হয় ১. মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর, ২. কর্নেল দেলোয়ার হোসেন, ৩. লে. কর্নেল দেলোয়ার হোসেন, ৪. মেজর মনির, ৫. মেজর দোস্ত মোহাম্মদ, ৬. মেজর মুজাফ্ফর, ৭. মেজর রেজাউল করিম, ৮. ক্যাপ্টেন রফিক, ৯. ক্যাপ্টেন ইলিয়াস, ১০. ক্যাপ্টেন জামিল, সর্বসাং-চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এবং আরো অনেকে।

এদের মধ্যে মেজর দোস্ত মোহাম্মদ ও ক্যাপ্টেন ইলিয়াস রেহাই পেলেও অন্যদের ফাঁসি হয়ে গেছে সামরিক ট্রাইব্যুনালের আদেশে। মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর আটক অবস্থায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিহত হন।






Related News

Comments are Closed