Main Menu

জবাব যদি না-ই পাই, তবে এর দায়মুক্তি থেকেও রেহায় নাই।বদরুল ইসলাম

: আমি তখন ঘিলাছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্র । ঐদিন আমাদের বাড়ীতে একটি শিন্নির আয়োজন চলছিল । সকাল প্রায় ৮ টার দিকে আমাদের বাড়ীর বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা বি ডি আর’র সুবেদার আক্তার আলী চুনু মিয়ার ঘরে রেডিওতে প্রথম শুনিতে পাই , আমি মেজর ডালিম বলছি কুখ্যাত মুজিবকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছে ! এহেন বুলেটিন বার বার থেমে থেমে রেডিওতে ঘোষনা করেছিল ঘাতক ডালিম ! ঐ ঘরের রেডিওতে শুনে তা আমার কোন প্রকারেই বিশ্বাস হচ্ছিলনা ! দৌড়ে আমাদের ঘরে এসে আমাদের রেডিও অন করলাম।

কিন্তু সে কি (!) একি বুলেটিন এখানেও শোনা যাচ্ছে ! তখন রেডিওর চ্যানেল বদল করতে থাকলাম । চট্টগ্রাম , সিলেট কেন্দ্র এইগুলো থেকে কোন কিছুই শোনা যাচ্ছিলোনা । শুধুই আবহাওয়াজনিত কারনে যেভাবে শোঁ শোঁ করে , ঐভাবেই বিকট শব্দ করছিল । আবার রেডিওর চ্যানেল বদল করে ঢাকা কেন্দ্রে নিয়ে আসলাম। সেই একই বুলেটিন! সমস্থ ঘরটা নিমিষেই নিরব-নিস্তব্দ হয়ে গেল! ধীরে ধীরে বাড়ীর অন্যরাও এসে আমাদের ঘরে জড়ো হতে থাকলেন।

আনোয়ার মামা , শওকত মামা , চুনু মামা ও খোকা মামাসহ সকলেই। পাশের বাড়ী থেকে আওয়ামীলীগ পাগল মখছু মামাও দৌড়ে আসলেন! কিন্তু এখানে এসে সকলেই নির্বাক, হতভম্ব ! কারো মুখে কোন কথা নেই ভাষা নেই! সকলেই হতভম্ব কিংকর্তব্যবিমূঢ় ! এভাবে বেলা গড়িয়ে দুপুর হলো , সকলেই নীরব বসে রইলেন । আবার চেষ্টা করা হলো ইন্ডিয়া বা অন্য কোথাও রেডিওর চ্যানেল বদল করে খবর শোনার, কিন্তু তখন কোথাও সংবাদের সময়সূচী না থাকাতে শোনা সম্ভব হলোনা । বিক্ষিপ্তভাবে বাড়ীতে আয়োজিত শিন্নির অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হলো ।

আমার স্পষ্ট মনে আছে ঐদিন বাড়ীতে আমাদের ঘরসহ সকলের ঘরে হাড়ি চূলায় বসে নাই, খাবার পেটে যায় নাই। সন্ধ্যা গড়িয়ে যেতেই সকলে আকাশবাণীর সংবাদ শোনার জন্য বাড়ীর উঠোনে জড়ো হলেন। ধীরে ধীরে সকলের উপস্থিতিতে পরিবেশটা অনেক আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠেছিল ! যথাসময়ে আকাশবাণীর সংবাদ শুরু হলো ।

শুরুতেই আকাশবাণী বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ই মার্চের জ্বালাময়ী ভাষনের অংশবিশেষ প্রচার করছিল। তখন আমার শিশুমন আনন্দে নেচে উঠেছিল । এই ভেবে যে , কে বললো বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে ! ঐতো বঙ্গবন্ধু জ্বালাময়ী ভাষন দিচ্ছেন। সেদিন সেই মুহুর্তে আমার মনটা তা-ই বলছিল। যাক যথাসময়ে আকাশবাণীর সংবাদ শুরু হলো। শুরুতেই শিরোনামে বলেছিল বাংলাদেশের কিছু সংখ্যক বিপথগামী ও উশৃংখল সেনাবাহিনী স্বপরিবারে বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছে ! এবং হত্যাকান্ডের আরো অন্যান্য বিবরণ দিচ্ছিলো !

ঐ সংবাদ শুনার পরে সকলেই ঐদিন মোটামোটিভাবে হত্যাকান্ডের ব্যাপারটা বিশ্বাস না করলেও একটা বিশ্বাসের পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিলেন।

আমার পরিস্কার মনে আছে আমার আব্বা ঘটনার তিনদিন পর্যন্ত বাড়ী থেকে কোথাও বাহির হন নাই। খুব প্রয়োজন ছাড়া কাহারও সাথে কোন কথাও বলেন নাই। খুব কম সংখ্যক দলীয় নেতা কর্মীর আসা যাওয়া লক্ষ্য করেছি। তার কারনও ছিল যথেষ্ট ।সম্ভবত ঘটনার পরের দিনই সারা দেশের ন্যায় আমাদের ফেঞ্চুগঞ্জেও সেনাবাহিনী এসে টহল ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার করেছিল। একটানা দিনরাত ৪/৫ দিনেক হবে আব্বা বাড়ীতে অবস্তান করলেও পরবর্ত্তীতে সকলের জোরালো অনূরোধে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

তখন দেশের আইন শৃংখলা পরিস্থিতি এমনি এক পর্যায়ে পৌছে ছিল যে , ভয়ে কেহ কোথাও কিছু বলাতো দূরে থাক কোথাও দাঁড়াতেই পারেনি । এরই মাঝে দেশে সামরিক শাষন জারি হয়ে গিয়েছিল। ৪/৫ জন কোথাও জড়ো হয়ে কিছু বলা বারনসহ না-না শর্ত্তারুপ জারি করেছিল সেদিন সামরিক জান্তা ! এমন কি সেদিন সেনাবাহিনী যাকে তাকে যেখান থেকে ইচ্ছা হাত বেধে চোখ বন্ধ করেও নিয়ে যেতো আর চরম নির্যাতন করতো ।

এমনি এক ভয়ানক আতংকোজনক অবস্তায় দিনাতিপাত হচ্ছিল আওয়ামীলীগ ও সকল অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ! তা আজ বলে শেষ করা যাবেনা বা বুঝানো যাবেনা ! সেদিন শুরু হয়েছিল সামরিক জান্তার আওয়ামীলীগ নিধনে না-না রকমের মাষ্টারপ্ল্যান আর ষ্টিম রুলার! বিভিন্ন ভাবে অতি কৌশলে আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদেরে গ্রেফতার, মামলা , নির্যাতন আর হয়রানীর কথা আজও ভূলি নাই! ভূলি নাই সেদিনের সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ! অবশেষে সেদিন সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হন আমার আব্বা জননেতা মো. আব্দুল লতিফ সাহেব।

তাঁহাকে ষড়যন্ত্র করে মিথ্যা বানোয়াট মামলায় ১৯৭৫ -এর ১৮ ই ডিসেম্বর গ্রেফতার করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দীর্ঘদিন কারাবরণ করতে হয়েছিল! তাঁহার অপরাধ তাদের ভাষ্যনুযায়ী : তিনি বিগত মুক্তিযুদ্ধে ভারতে থাকিয়া মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য সহায়তা করেন। এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার সাথে সাথে বাড়ীতে আসিয়া থানা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারি ও থানা প্রশাসক হিসাবে মুক্তিযুদ্ধাদের সাথে কার্য্য পরিচালনা করেন।

মামলার গোপনীয় তদন্তে জানা গেল যে উপরোক্ত আসামী বর্ত্তমানে বাড়ীতে থাকিয়া পূর্বের মুক্তিবাহিনীর যোগসাজশে না-না প্রকার চুরি-ডাকাতির সাহায্য করিয়া আসিতেছে বলে সন্দেহ করা যাইতেছে বিধায় তাহাকে গ্রেফতার করা হয়। এই মর্মে সেদিন আমার আব্বাকে অহেতুক গ্রেফতার করিয়া মহামান্য আদালতে পুলিশ রিপোর্ট প্রদানকৃত আদালতের অংশবিশেষ ! তারই প্রেক্ষিতে তিনি দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন এবং পরবর্তিতে অনেক অনেক ঝড়-তুফান সহ্য করে মুক্তিলাভ করেন।

সেদিন সেই বিপদের সময়ে যাহাদের সর্বক্ষেত্রে সহযোগীতা পেয়েছিলাম আজ তাঁদের নাম স্মরন করতে চাই । তাঁহারা হলেন গোলাঘাটের মরহুম সফিকুর রহমান , ইসলাম পুরের মরহুম ছন্তর আলী ( আলহাজ্ব আলী আহসান শাহীনের বাবা )। এই দুইজন মহৎ উপকারী আওয়ামীলীগের নেতাকে আজ তাদের উপকারের জন্য স্বশ্রদ্ধ শ্রদ্ধার সহিত স্মরন করি । এবং তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি ।

আজ দু:খের সঙ্গে বলতে হয় আওয়ামীলীগের প্রতিস্টালগ্ন থেকে আমৃত্যু পর্যন্ত (১৯৯৮ ইং) না-না লঞ্চনা-বঞ্চনা , নির্যাতন , জ্বেল জুলুম এবং হুলিয়াসহ অনেক কিছু সহ্য করে , ত্যাগ করেছেন আমার বাবা জননেতা মরহুম মো. আব্দুল লতিফ সাহেব এবং আমার গোটা পরিবার ।

আজ আওয়ামীলীগের এই সুবর্ণ সময়ে আমরা কি পেয়েছি !? কি পেলাম!? এটাই আমার জিজ্ঞাসা জাতির নিকটে ??? আমি জানি আমার এই প্রশ্নের জবাব আমি পাবো না !? জবাব যদি না-ই পাই, তবে এর অভিশাপ আর দায়মুক্তি থেকেও রেহায় নাই, মুক্তি নাই, রক্ষা নাই !?

লেখক পরিচিতি :: শাহ মো: বদরুল ইসলাম- সাবেক সাধারন সম্পাদক ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা যুবলীগ, সাবেক সদস্য সিলেট জেলা যুবলীগ এবং সভাপতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন মঞ্চ ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা শাখা। ফেঞ্চুগঞ্জ , সিলেট ।

সম্পাদনায় এমরান আহমেদ






Related News

Comments are Closed