Main Menu

গুজব ছড়িয়ে লবণের বাজার অস্থির

ডেস্ক রিপোর্ট ::

এবার গুজব ছড়িয়ে লবণের বাজার অস্থির করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে একটি চক্র। সোমবার বিকেলের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে লবণের মূল্যবৃদ্ধির গুজব। সৃষ্টি করা হয় কৃত্রিম লবণ সংকট। এরপর থেকেই নগরীর খুচরা ও পাইকারি দোকানগুলোতে লবণ কেনার হিড়িক পড়ে যায়। পাশাপশি সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় ও গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে গুজব। সাধারণ মানুষ ৫ কেজি, ১০ কেজি করে লবণ কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরেন। সন্ধ্যার সাথে সাথে খুচরা দোকানগুলোতে সব লবণ বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। চারিদিকে মানুষের মুখে মুখে শুধু লবণ, লবণ আর লবণ। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লবণের দাম বৃদ্ধি করে ফেলেন খুচরা ও পাইকারি দোকানদাররা। পাশাপাশি কালিঘাটের পাইকারি দোকানগুলো থেকে পিকআপ, ভ্যানগাড়ি, রিকশা ভর্তি করে লবণ কিনে নিয়ে যান খুচরা ব্যাবসায়িরা। দুপুরের পর থেকে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে লবণের দাম বৃদ্ধির খবর পাওয়া যায়। জকিগঞ্জের বিভিন্ন বাজারে লবণের দাম বাড়র খবর পেয়েই লবণ বিক্রি বন্ধ করে দেন ব্যবসায়িরা। জকিগঞ্জের বিভিন্ন দোকানে ১০০-১২০ টাকা কেজি লবণ বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক ব্যবসায়ি ও ক্রেতা। কোথা থেকে এমন খবর পেয়েছেন, এর জবাবে তারা ‘শুনেছেন’ বলে জানান।

সোমবার রাতে বিশ্বনাথ উপজেলা সদরে মাইকিং করে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহবান জানিয়েছেন উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ফাতেমা তুজ জোহরা ও থানার ওসি শামিম মুসা। এসময় তারা বলেন, গুজবে কান দেবেননা। দেশের সব জায়গায় লবণের প্রচুর মজুদ আছে। কেউ আধা কেজির উপর লবণ না কিনতে এসময় গ্রাহকদের কাছে তারা আহবান জানিয়েছেন। নির্ধারিত দামের উপর কেউ এক টাকা দাম নিলে প্রশাসন ব্যবস্থা নিবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।

রাতের বেলা লাভের আশায় মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত রওয়ানা দেন ফেঞ্চুগঞ্জের পালবাড়ির মোস্তফা মিয়ার ছেলে জুনেল মিয়া (২৬) ও তার এক বন্ধু। তাড়াহুড়া করে যেতে গিয়ে তারা দুর্ঘটনার শিকার হোন পানিশাইল এলাকায়। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সাথে ধাক্কা খেয়ে গুরুতর আহত হন তারা। আহতদের স্বজন জানান, জুনেলের বন্ধুর নাক ফেটেছে ও জুনেলেন পায়ের রগ কেটে যায়। স্থানীয় জনতা তাদেরকে উদ্ধার করে সিলেটের এমএজি ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যান।

অতিরিক্ত দামে লবণসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি ও মূল্য তালিকা না টাঙানোর অপরাধে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় সাতটি দোকানের মালিককে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সোমবার বিকেল সাড়ে চারটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে নেতৃত্ব দেন বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. শামীম আল ইমরান।

বিয়ানীবাজার উপজেলার সারপার, পাতাড়িপাড়াসহ মুড়িয়া ইউনিয়নের পূর্বদিক সীমান্ত এলাকার হাট-বাজারে লবণ বিক্রি হচ্ছে ১শত থেকে ১২০ টাকায়। লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব তুলে সাধারণ মানুষকে শংকায় ফেলে লাভবান হচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ি। লবণের দাম বৃদ্ধির আতঙ্ক তুলে বেশি দামের লবণ বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করেন ওই এলাকার আলীম উদ্দিন আল মামুন নামে এক ক্রেতা। তিনি বলেন, একটি মহল পেঁয়াজের মতো লবণের দাম বাড়ার গুজব তুলেছে এলাকায়। এতে করে সারপারবাজার ও স্থানীয় গ্রামের দোকানের সব লবণ কয়েক ঘন্টার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। এ সুযোগে ব্যবসায়িরা কেজি প্রতি ১শ থেকে ১২০ টাকায় লবণ বিক্রি করেছেন।

বিয়ানীবাজার মধ্যবাজারের ব্যবসায়ি কয়ছর আহমদ বলেন, লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব আমাদের কাছেও এসেছে। আমার সিলেটে যোগাযোগ করে এর কোন সত্যতা পাইনি। এছাড়া লবণ কোম্পানির সংশ্লিষ্টদের কাছে এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা এটি হুজব বলে উড়িয়ে দেন। তিনি জানান, আগের দামে (৩০ ও ৪০ টাকা) বিয়ানীবাজারে লবণ বিক্রি হচ্ছে।

একইভাবে লবণের দাম বৃদ্ধির গুজবে বেশি দামে লবণ বিক্রি করছেন বৈরাগীবাজারের ব্যবসায়িরা। বৈরাগী ব্যবসায়ি আহমদ হোসেন বলেন, আগামী সপ্তাহে দাম বৃদ্ধির পাবে এমন খবর ছড়িয়ে দিয়েছে কে বা কারা। এ খবরটি ছড়িয়ে পড়লে লোকজন লবণ কিনতে দোকানে ভিড় করেন এবং ব্যবসায়িরা প্রতি কেজি ৫০ টাকা করে বিক্রি করছেন।

অপরদিকে, বৈরাগীবাজারে বেশি দামে লবণ বিক্রি করায় ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে সিদ্দিক আহমদ নামের এক ব্যবসায়িকে আটক করেছে। সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী মাহবুব এ ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন বিয়ানীবাজার থানার ওসি অবনী শংকর কর।

গুজবে পাত্তা দিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ি কমলগঞ্জের ভানুগাছ বাজার, আদমপুর, মুন্সীবাজার, শমসেরনগর বাজারসহ বিভিন্ন হাট বাজারে লবণ বেশি দামে বিক্রি শুরু করছে। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। লবণের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে এমন খবরে সাধারণ মানুষ মুদি দোকানগুলোতে লবণ ক্রয়ের জন্য ভিড় জমাচ্ছেন।

রাত সাড়ে ১০টায় হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরী বাজার এলাকার রহমান এন্টারপ্রাইজ থেকে প্রায় ২০ বস্তা লবণ জব্দ ও ৪ জনকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের পরিচয় জানানো হয়নি। অভিযানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আমিরুল ইসলাম মাসুদসহ একদল পুলিশ উপস্থিত ছিলেন।

আমিরুল ইসলাম জানান, লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করায় ৪ জন আটক ও ২০ বস্তা লবণ জব্দ করা হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার প্রস্তুতি চলছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হবিগঞ্জ জেলা শহর, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং, চুনারুঘাট ও বাহুবল উপজেলায় একদিনের মধ্যেই লবণের মূল্য বাড়বে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর দোকানে ভিড় করতে শুরু করেন ক্রেতারা।

গুজবকে কেন্দ্র করে এই হুলস্থূলের প্রেক্ষিতে সোমবার সন্ধ্যায় জনগণকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান সিলেটের পুলিশ সুপার ফরিদ উদ্দিন। নিজের ফেসবুকে পুলিশ সুপার লিখেন- ‘প্রিয় সিলেটবাসী, বাজারে নিত্য-প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। কোন নিত্য-প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম বাড়তে পারে-এমন গুজবে কান না দেয়ার জন্য সকলকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

এদিকে নগরীতে গুজবের খবর পেয়ে বাজার মনিটরিংয়ে নামে গোয়েন্দা সংস্থা এন.এস.আই এর একাধিক টিম। সোমবার রাত ৮টায় নগরীর কালিঘাটে ৪শ ৫০ কেজি লবণ আটক করে এন.এস.আই এর প্রতিনিধি দলের সদস্য মো. আব্দুস সালাম, এবি সিদ্দিকিসহ অন্যরা। দুটি ভ্যানগাড়ি এবং একটি রিকশায় করে লবণগুলো মজুত করার জন্য নিয়ে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। লবণ আটক করার সাথে সাথে সটকে পড়েন তিনি। লবণ আটকের পর এন.এসআই সদস্যরা কোতোয়ালি থানাকে অবহিত করলে তাৎক্ষণিক বন্দরবাজার ফাড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ফোর্স নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। এরপর সেখানে আসেন সিলেট সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুমন্ত ব্যানার্জি এবং জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারি কমিশনার মেজবাহ উদ্দিন।

সিলেট সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুমন্ত ব্যানার্জি জানান, আটককৃত লবণগুলো থানায় নিয়ে বিধি মোতাবেক প্রকাশ্যে নিলাম করা হবে। অসাধু ব্যবসায়িরা যাতে এভাবে গুজব ছড়িয়ে লোক ঠকাতে না পারে সেজন্য অভিযান অব্যাহত থাকবে।

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার মেজবাহ উদ্দিন, বলেন আমরা নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছি এবং ব্যবসায়িদের সতর্ক করছি যাতে বেশি দামে লবণ বিক্রি না করেন। এটা শুধু মাত্র একটা গুজব। শ্রীঘ্রই গুজব সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

রাত ৯টায় সিলেট নগরীর কালঘাট বাজারের ব্যাবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন পাইকারী দোকান পরিদর্শন করেন এনএসআই নেতৃবৃন্দ। এসময় দেখা যায়, পাইকারী দোকানগুলোতে স্থীতিশীল রয়েছে লবণের মূল্য। নেই কোনো সংকট।

এসময় রহমত স্টোর নামে একটি দোকানের মালিক রহমত আলী জানান, সোমবার বেলা ৩টার দিকে একজন মাস্ক পড়া লোক এসে ১ হাজার কেজি লবণ কিনতে চান। কিন্তু রহমত আলীর দোকানে লবণ না থাকায় তিনি অন্য একটি পাইকারী দোকান দেখিয়ে দেন লোকটিকে। এরপর সন্ধ্যায় শুরু হয় কৃত্রিম সংকট।

কালীঘাট বাজার সমিতির সভাপতি জিয়াউল হক জিয়া বলেন, বাজার স্থীতিশীল রয়েছে। লবণের কোনো সংকট নেই। একটি অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পায়তারা করছে। আমরা ব্যবসায়িরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছি। সাধারণ ক্রেতাদের গুজবে কান না দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।

এদিকে রাত ১২টায় ৯০ টাকা করে প্রতি কেজি লবণ বিক্রি করায় মদিনা মার্কেট আফতাব ম্যানশনের বি.আর স্টোরকে ১৫ হাজার টাকা, রঞ্জিত স্টোরকে ১৫ হাজার টাকা ও সায়েম ট্রেডার্সকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা জরিমানা করেন এসিল্যান্ড সুমন্ত ব্যানার্জি। সারারাত ধরে এ অভিযান চলবে বলে জানান তিনি।






Related News

Comments are Closed